সূর্য উঠেছে বেশ কিছুক্ষন।রোদের উত্তাপ চড়তে শুরু করেছে।রোদের আলোয় সবকিছু কেমন ঝকঝক করছে।বালিয়াড়ির বালুগুলোও চিকচিক করছে রোদের আলোয়।দীগন্ত বিস্মৃত নীল আকাশ ও সমুদ্রের মিশেলে মনে হচ্ছে কেউ বিশাল একটা ক্যানভাস দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।চারদিকে যা কিছুই দেখছি তার সবই অসম্ভব সুন্দর মনে হচ্ছে।মনে হচ্ছে সবকিছুই কোন শিল্পীর পটে আঁকা ছবি।মনের মাধুরী মিশিয়ে যতনে এঁকেছেন শিল্পী ক্যানভাসের প্রতিটা কোণ।ক্যানভাসের প্রতিটা কোণে ছড়িয়ে আছে শিল্পীর ভালোবাসা।
![]() |
| ঝকঝকে বালিয়াড়ি..... |
গতকাল তেমন ভালো করে দেখা হয়নি দারুচিনি দ্বীপের সৌন্দর্য, আর আজকে যত দেখছি ততই আমার বিস্ময় ক্রমশই বৃদ্ধি পাচ্ছে।এতটা সুন্দর হতে পারে সৃষ্টার সৃষ্টি??চোখ ঝলসে যাচ্ছে দারুচিনি দ্বীপের সৌন্দর্যে।
![]() |
| দারুচিনি দ্বীপের কান্না......... |
![]() |
| গোধূলি লগ্নে দারুচিনি দ্বীপ..... |
.......
গতকালই এসেছি দারুচিনি দ্বীপে।ভ্রমন ক্লান্তিতে বেঘোরে ঘুমিয়েছি সারা রাত্রি,এক ঘুমেই নিমেষে রাত শেষ।রাতে বীচ পার্টি,বারবিকিউ করা,বন ফায়ার করা,গানের আসর বসানো,জীবনের সুখ দুঃখের গল্প ও স্বপ্নগুলো শেয়ার করার আড্ডা কিছুই হয়নি।সমস্ত পরিকল্পনা শিকে তুলে বিছানায় নিদ্রা দেবীর আরাধনা করাই শ্রেয় মনে হয়েছে সবার নিকট।
উত্তাল সমুদ্রের হু হু হাওয়ায় কনকনে ঠান্ডা লেগেছে রাতে অথচ ঢাকায় এই এখনই বেশ গরম পড়তে শুরু করেছে।
.......
আমাদের তাঁবু ⛺ খাটানো হয়েছে উন্মুক্ত বালিয়াড়িতে।আয়েশ করে হোটেলেই থাকা যেত,এখন অফ সীজন টুরিস্টের চাপও কম।সস্তায় ভালো হোটেলই পাওয়া যেত কিন্তু পরিকল্পনা ছিলো সমুদ্রের নিকটে তাঁবুতে থাকবো।রাতে যখন ঘুমাতে যাবো তখন সমুদ্রের হু হু হাওয়া এলোমেলো করে দিয়ে ছুঁয়ে যাবে তাঁবু।কোথাও পড়েছিলাম বা শুনেছিলাম সমুদ্রের হুহু বাতাসে কান পাতলে সমুদ্রের কষ্ট ও কান্না শুনতে পাওয়া যায়।বোধকরি ঘুরতে এসে আমার মত কেউ কেউ নিজেদের কষ্ট গুলো সমুদ্রের হু হু বাতাসে ছড়িয়ে দেয়।
.....
রাতে দারুচিনি দ্বীপে সমুদ্রের আছড়ে পরা বাঁধভাঙা ঢেউয়ের শব্দ শুনবো তাঁবুতে ⛺ শুয়ে শুয়েই।ভাবতেই মনে হচ্ছে বেশ উপভোগ্য হবে ব্যাপারটা।যদি কপাল আরেকটু ভালো হয় তবে হয়তো চাঁদনী রাতও পাওয়া যেতে পারে।চাঁদনী রাতে চাঁদের আলোতে মনে হবে সমুদ্রের নীলজল গলন্ত তরল সীসার রুপ ধারণ করেছে।তরল সে সিসা মোহনীয় আকর্ষণে ঢাকছে সমুদ্র অবগাহন করার জন্য,সে ডাক উপেক্ষা করা মুশকিলের।সত্যি মুশকিলের।
![]() |
| নারিকেল জিঞ্জিরা....... |
........
সৈকত জুড়ে বালিতে ছোটাছুটি করছে লাল রংয়ের কাঁকড়া। কাঁকড়া গুলো সামনের দিকে হাতের মত দুইটা দাড়া দাঁড় করিয়ে রেখেছে,ওদের সামনে যাওয়ার আগেই কেমনে যেন বুঝে যায়।চট করে সবগুলো একত্রে ছুট লাগায়।লাল টকটকে কাঁকড়া গুলোর ছোটাছুটি বেশ মনমুগ্ধকর একটা দৃশ্য।
নীল উত্তাল সমুদ্রে হুটোপুটি করছে গাঙচিলের দল।দূরে তটের অদূরে নোঙর ফেলা জেলেদের মাছ ধরার ট্রলার গুলোই হল গাঙচিল দলের মূল লক্ষ।চুপিচুপি ছোঁ মেরে যদি দুই একটা মাছ নেওয়া যায় সে ধান্দায় আছে গাঙচিলের দল।নীল আকাশের ক্যানভাসে সাদা গাঙচিলের উড়ন্ত পালের ছবিতে কিছু একটা আছে।খুবই সুন্দর, খুবই আকর্ষণীয় কিছু।আমি ধরতে পারছি না সেটা কি।
![]() |
![]() |
| দুরন্ত গাঙ্গচিলের পাল...... |
ইতিউতি প্রবালের ছড়াছড়ি।চকচকে জলে প্রবাল গুলো খুবই সুন্দর লাগছে দেখতে।কোন কোন জায়গায় মনে হয় হাত ছোয়া দুরত্বে আছে প্রবাল প্রাচীর।আসলে পানি এতটা স্বচ্ছ যে পানির নিচে প্রবালের সঠিক দুরত্ব অনুমান করা দুষ্কর। মাঝে মাঝে চোখে পড়ে প্রবাল প্রাচীরের ফাঁকে ফাঁকে নাম না জানা অসম্ভব সুন্দর সুন্দর সামুদ্রিক মাছ বা প্রাণীর। সময় গড়িয়ে আর কিছুক্ষন পরেই জোয়ার আসবে।ঢেউ বাড়ছে আকার আকৃতিতে।ঢেউয়ের আকার আকৃতি বলছে জোয়ার সন্নিকটে।
.......
ছোটবেলা থেকেই আমি ভীষণ ঘরকুনো।পারতপক্ষে প্রয়োজন নাহলে আমি তেমন একটা বের হই না ঘর থেকে,অভ্যাসটা সেই ছোটবেলা থেকেই।ঘরের এককোণে ঘাপটি মেরে চুপটি করে আপন খেয়ালে থাকতে থাকতেই এতটা বেলা হয়ে গেলো।বন্ধুরা মজা করে বলে আমি গর্তবাসী বা গুহাবাসী।ঘটনা খানিকটা সত্যি। আসলেই গর্তছেড়ে বের হতে মন চায় না।
ঘর ছেড়ে বাহিরের জগত দেখার সূচনা হয়েছিলো ভ্রমন করতে গিয়ে,আর বাহিরে ঘুরাঘুরি করতে যাওয়ার সূচনা হয়েছিলো আমার বাল্যবন্ধুদের বদৌলতে।আমরা বন্ধুরা প্রায় প্রতি বছরই বেশ আয়োজন করে পরিকল্পনা করে ঘুরতে বের হই ইতিউতি।ট্যুরে গিয়ে পাহাড়,নদী,খালবিল,সবুজ,ঝর্ণ া কত কি দেখেছি আমরা।পেরিয়েছি পাহাড়ের চড়াই উৎরাই,দেখেছি দিগন্ত বিস্তৃত সবুজের সমারোহ।দেশের বাহিরেও ঘুরাঘুরি করার সৌভাগ্য হয়েছে কিন্তু এত এত ঘুরাঘুরি করার পরেও কোথাও যেন একটা অপূর্নতা রয়ে গিয়েছিলো।
........
![]() |
| আমার একাকী বিষন্নতা..... |
আমার সবসময়ের একটা আক্ষেপ থেকে গিয়েছিল।সমুদ্র দেখার সৌভাগ্য হয়নি আমার এখনও।উত্তাল নীল সমুদ্রের বাঁধভাঙ্গা ঢেউ কিংবা সমুদ্রের কিনারা ঘেঁষে হু হু করে বয়ে যাওয়া হাওয়া কিংবা সমুদ্রতটের বালিয়াড়িতে খালি পায়ে হেঁটে বেড়ানো হয়নি কখনো।দেখা হয়নি রাতের জোসনায় ভেসে যাওয়া সমুদ্র, দেখা হয়নি গাঙচিলের হুটোপুটি,সৈকতের বালিয়াড়ি ধরে ছুটে চলা লাল কাঁকড়া দলের দুরন্ত গতিতে ছুটে চলা।কত কি দেখার বাকি এখনও।
মাঝে মাঝেই ভাবি কেমন হবে দারুচিনি দ্বীপের নীল আকাশের ক্যানভাসে সাদা গাঙচিলের ছবিটা?জেলে নৌকার সারবেঁধে নোঙর ফেলে রাখা ছবিটাই বা কেমন হবে?উত্তাল সমুদ্রের হু হু হাওয়ায় চাপা পড়া কষ্টগুলো কি বাতাসে ফিসফিসিয়ে কথা বলে?রাতে সৈকতে তাঁবু ⛺ খাটিয়ে থাকবো।চাঁদনী রাত হলে জোসনার আলোয় ভেসে যাওয়া সৈকতের চিকচিক করা বালিয়াড়ি অথবা সাদা দুগ্ধ স্রোতের ন্যায় সমুদ্রের আছড়ে পড়া ঢেউয়ের ছবিটাই বা কেমন হবে?কিছুই জানি না আমি।খুব করে জানতে চাই এই সবই।স্মৃতি বন্দী করতে চাই প্রতিটা মুহূর্ত।ধরে রাখতে চাই প্রতিটা ক্ষন।অমূল্য সেই ক্ষনগুলো।সেটা আদৌ কখন হবে জানি না।
.......
আমার খুবই প্রিয় একটা বাংলা মুভি দারুচিনি দ্বীপ।প্রয়াত প্রিয় লেখক হুমায়ুন আহমেদের অসাধারণ একটা সৃষ্টি এই দারুচিনি দ্বীপ।মধ্যবিত্তের টানাপোড়েনের জীবনে সামান্য একটি স্বপ্ন বা শখ কতটা মানে রাখে সেটা বুঝা যায় দারুচিনি দ্বীপ উপন্যাস/মুভিটা দেখলে।সামান্য একটা ট্যুর করতেও কতটা অনিশ্চয়তা চড়াই উৎরাই পেরোতে হয় সেটারই এক নিদারুণ কষ্টের প্রতিছবি দারুচিনি দ্বীপ।
দারুচিনি দ্বীপ,নারিকেল জিঞ্জিরা,সেন্টমার্টিন কতই না তার নাম,কিন্তু সবাই সেন্টমার্টিন নামেই বেশি চিনে।উপন্যাসের সেই দারুচিনি দ্বীপে বাস্তবে যাওয়ার খুব ইচ্ছে হয়।এখনও সময় ও সুযোগ হয়ে উঠেনি।বন্ধুরা সবাই ঘুরে এসেছে ইতিমধ্যেই,শুধু আমারই যাওয়া হয়নি।সবকিছু গোছগাছ থাকা স্বত্তেও যাওয়া হয়নি দারুচিনি দ্বীপের নীলে।হয়তো ভাগ্যে ছিলো না।তবে সময় সুযোগ পেলেই একবার ছুটে যেতে চাই দারুচিনি দ্বীপে।
.......
মধ্যবিত্তের আটপৌরে টানাপোড়েনের জীবনে ছোটবেলা থেকে কত কত শখ বাক্সবন্দী করে তুলে রেখেছি।মধ্যবিত্তের শখ করতে নেই,ঐটা শুধুই বড়লোকের জন্যে।এটাই শুনে আসছি ছোটবেলা থেকে।এক সময় মুখ বুঝে মেনেও নিতাম। এখন মন অবাধ্য হয়ে উঠে। মাঝে মাঝে বিদ্রোহ করতে মন চায়।আমি একটা পরিকল্পনা করেছি।বলা যায় চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছি।সেটা হল অল্প কয়দিনের ছোট্ট এই জীবনে সাধ্যের মধ্যে সম্ভব কোন ইচ্ছেই অপূর্ণ থাকবে না।অপূর্ণ রাখবো না।দুইদিন আগে হোক দুইদিন পরে সবই পূর্ণ করবো।কোন অপূর্ণতা থাকবে না।কোন অপূর্নতা রাখবো না ইনশাআল্লাহ।
আমিও যাবো সাদা নীলের ক্যানভাসে গাঙচিলের উড়াউড়ি দেখতে দারুচিনি দ্বীপের নীলে।
![]() |
| সাদা নীলের ক্যানভাসে........ |
সাদা নীলের ক্যানভাসে........
যাযাবরের ডায়েরি......📙
২৫শে ডিসেম্বর,২০১৮।মঙ্গলবার।
রাত ১০.৫৫।ঢাকা।




















Comments
Post a Comment