বহু কাঠখড় পুড়িয়ে তবেই বের হয়েছিলাম এবারের ট্যুরের জন্য।চাকুরিজীবি হওয়ায় নিজের জন্য একান্ত সময় বের করা বেশ মুশকিলই।তাই পরিকল্পনা ছিলো আসন্ন ঈদ-উল-ফিতরের ছুটিটা কাজে লাগাবো।আচমকায় মাথা আসলো শিমলা,মানালী যাবো।শিমলা,মানালিতে বরফ দেখার ইচ্ছে ছিলো।যদিও জুনের শেষ নাগাদ বরফ গলতে গলতে প্রায় শেষের দিকেই থাকে।বরফ দেখতে হলে যেতে হবে নভেম্বর,ডিসেম্বর মাসে।তারপরও শিমলা,মানালির পোকাটা মাথায় ঢুকবার পর আর বের হচ্ছিলো না।ঈদ সামনে রেখে গত ১৪ জুন তারিখ দিবাগত রাতে যখন রওনা করেছিলাম তখনও জানতাম না এবারের ট্যুর হবে নানাদিক থেকে আমার জন্য চ্যালেঞ্জের।
দেশের বাইরে কখনো ঈদ করি নাই,এটাই ছিলো পরিবার ছাড়া জীবনের প্রথম ঈদ।স্বাভাবিক ভাবেই প্রচন্ড রকমের হোম সীকনেসে ভুগছিলাম।তার উপর একলা বের হয়ে গিয়েছি ট্যুরে।সাথে আড্ডা দেওয়ার,গল্প করার,খুনসুঁটি করার কেউ ছিলো না।মরার উপর খাঁড়ার গায়ের মত কলকাতায় একটা ইন্সিডেন্টের কারনে প্রচন্ড রকমের আপসেট ছিলাম (এই ঘটনাটি আমি শেয়ার করবো সবার সর্তকতা সাবধানতা অবলম্বনের জন্য)।
কলকা হাওড়া মেইলের দীর্ঘ ট্রেন জার্নি পথে উদাসভাবে ট্রেনের জানালা দিয়ে দিগন্তরেখার দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার ছিলো না। তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম,কিন্তু কলকা থেকে টয় ট্রেনের জার্নি শুরু হবার পরপরই আস্তে আস্তে মনটা ভালো হয়ে গেলো।
কলকা থেকে শিমলার দূরত্ব কমবেশি ৯০ কিলোমিটার।টয় ট্রেনে মোটামুটি ছয় থেকে সাড়ে ছয় ঘন্টা সময় লাগে এই দূরত্ব পাড়ি দিতে।যাত্রা পথে ছোট বড় পাহাড়,গহীন অরণ্য,মেঘমালা,আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা,পাহাড়ের কোল ঘেষা রঙ্গীন বাড়িঘর গুলো মুগ্ধ করে।কিছুক্ষণ পরপরই বাঁক এবং টানেল আসে।টানেলের অন্ধকার রোমাঞ্চকর অনুভূতি ছড়িয়ে দেয় মনে।সবচেয়ে ভালো লেগেছিলো কিছুক্ষণ পরপর আসা ছোট ছোট স্টেশন গুলো।এক একটা একেক রংয়ের ছোট্ট ছিমছাম স্টেশমগুলো।বেশ সুন্দর মিষ্টি ছন্দময় নাম স্টেশন গুলোর।ধরমপুর, সোলান, কান্দাঘাট, তারাদেবী, সালগোরা, টটু, সামারহিল,ছগ্গি।প্রায় প্রতিটি স্টেশনেই থামে টয় ট্রেন।স্টেশনগুলোতে হুইসেল বাজিয়ে ট্রেন ঢুকতে না ঢুকতে হুড়োহুড়ি করে নামে টয় ট্রেনের যাত্রীরা।নেমেই উড়াধুড়া ছবি তোলা শুরু করে।যেন কে কতগুলো স্মৃতিকে ফ্রেমবন্দী করতে পারবে তার প্রতিযোগিতা।আবার ট্রেন যখন হুইসেল দেয় সব পড়িমরি করে ছুটে ট্রেনের উদ্দ্যেশে।
ছুটতে ছুটতে এক সময় পৌছে গেলাম শিমলা।তখন বিকেল গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যা।যখন শিমলা নামলাম তখন শিমলার আকাশ মুখ ঘোমড়া করে রেখেছে।হয়তোবা অভিমান করেই অশ্রু বর্ষন করছে পাহাড়ের গায়ে।টিপটিপ করে সকাল থেকেই থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছিলো সারাটা আসার পথে,এখনও অব্যাহত আছে।রওনা করার সময় উত্তেজনায় ঠান্ডার প্রতিষেধক (গরম কাপড়)আনা হয়নি বেখেয়ালে।শিমলা তে নেমেই ঠান্ডা টের পাচ্ছিলাম বেশ ভালোভাবেই।
ট্রয় ট্রেনে আসতে আসতে বারবারই ট্রেনের জানালার ফাঁক গলে নজরে এসেছে শিমলার সৌন্দর্য।দূরে দিগন্তরেখা বরাবর পাহাড় গুলো যেন জ্বলছে।ধোয়া উঠা মেঘের আড়াল থেকে মাঝে মাঝেই উঁকি মারছে পাহাড় কন্য শিমলা।প্রকৃতি নিজের মত করে সেজেছে এবং সাজিয়েছে এখানে শিমলা কে।সেজন্যই হয়তোবা বলা হয় " Shimla - The Queen of Hills"
অনেক্ষণ বৃষ্টিতে ভিজে শিমলা স্টেশন ও আকাশ কালো করে থাকা মেঘমালা দেখে যখন হোটেলের উদ্দেশ্যে রওনা করবো তখন জানলাম আমার হোটেল এখান থেকে বেশ খানিকটা দূরে।বাস ধরে যাওয়া যায় তবে বৃষ্টির তীব্রতা দেখে আর সেদিকে গেলাম না।সোজা ট্যাক্সি ধরে পৌছে গেলাম শিমলা মলরোড সংলগ্ন খানিকটা উঁচুতে হোটেলে। হোটেলে চেকইন করেই ফর্মালিটি শেষ করে ছুটলাম পরদিন রাতে মানালীর টিকেট করতে।ততক্ষণে পুরোপুরি সন্ধ্যা নেমেছে শিমলার পাহাড়ি বুকে।দূর পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে বাড়ি গুলোর বাতি ঝলছে পিদিমের মত টিমটিম করেই।
দিনের বেলায় দেখা শিমলা সন্ধ্যায় মনে হলো আরো বেশি সুন্দর দেখাচ্ছে।খানিক্ষন উদ্দেশ্যে বিহীন ভাবে মলরোড চত্বরে ঘুরপাক খেয়ে একে তাকে জিজ্ঞেস করে ছুটলাম পরদিন রাতের জন্য মানালীর টিকেট করতে।বেশ ঝক্কি পোহাতে হয়েছিলো টিকেট করার জন্য।ঝামেলা করে টিকেট কেটে যখন হোটেলে ফিরলাম ততক্ষণে রাত প্রায় দশটা।গোসল,খাওয়া দাওয়া সেড়ে সোজা বিছানায় চলে গেলাম,সকাল সকাল উঠতে হবে শিমলা ঘুরার জন্য।
জুন জুলাই এই সময়ে কুফরিতে যাওয়া একটু কষ্টকর, ঝামেলার।সারাদিন থেমে থেমে হুটহাট করেই বৃষ্টি হয়।পাহাড়ি রাস্তা ভিজে কর্দমাক্ত হয়ে থাকে।কুফরিতে পযাওয়ার জন্য সরকারি রেটে ঘোড়ায় চড়ে যাওয়ার বন্দোবস্ত আছে।জনপ্রতি ৫০০রুপি নিবে।
কুফরিতে দেখেছিলাম কুফরি ভ্যালী,আপেল গার্ডেন,কুফরি ফান ওয়ার্ল্ড এন্ড এমিউজমেন্ট পার্ক,পাহাড়ি গ্রাম এবং বাজার।এছাড়াও শক্তিশালী দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে দেখেছিলাম দূরের বিভিন্ন পাহাড়ি নিদর্শন।এর মধ্যে উল্লেযোগ্য ছিলো ঐতিহাসিক শিমলা হাউজ।ঘুরতে ঘুরতে ক্ষুধায় ক্লান্ত হয়ে পাহাড়ের উপরে খেয়েছিলাম ম্যাগী নুডুলস। মজার বিষয় এখানেও ম্যাগী নুডুলস পাওয়া যায় এই এতটা উপরে পাহাড়ে,আবার সেটা খেতে স্বাদেও অনন্যা।সবচেয়ে ভালো লেগেছিলো খাওয়া শেষে হীম হীম ঠান্ডায় ধোঁয়া উঠা এককাপ চা।এলাচি দেওয়া এককাপ ধোঁয়া উঠা চায়ের স্বাদ বলে বুঝানো যাবে না।
সন্ধ্যায় হোটেলে ফিরে ব্যাগ গুছিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম শিমলার বিখ্যাত মলরোডে ঘুরতে।সন্ধ্যার কোমল ঠান্ডায় মলরোড দেখার মত জিনিস।দিনের শিমলা ও রাতের শিমলা সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপের।সারাদিন কর্মব্যস্ত শিমলার মানুষ দিনে শেষে ক্লান্তি ভুলতে আড্ডা,গল্পে মশগুল হয় সন্ধ্যায়।বিশেষত সন্ধ্যায় মলরোড টুরিস্টদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠে।দেখতে দেখতে সন্ধ্যা গড়িয়ে পাহাড়ি রাত নেমে এলো ঝুপ করে।হাতে সময় ছিলো না,তাই ছুটতে হল মানালির বাস ধরার জন্য।ছুটতে ছুটতে বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে কোন রকমে মানালির বাসে চড়ে বসলাম।
 |
| সন্ধ্যার শিমলা......... |
 |
| গুরুদোয়ারা শিমলা........... |
বাস যখন ছেড়ে দিলো তখন দ্রুত পিছনে ছুটে চলা রাতের আধাঁরে শিমলাকে দেখে কেমন যেন মন খারাপ হয়ে গেলো।দূর বহু দূরে পাহাড়ে পাহাড়ে টিমমটিম করে ঝলছে রাতের শিমলা শহর।ইলেকট্রসিটির বৌদলতে পাহাড়ের বহু উপরেও পৌছে গেছে বাতি,যেগুলো রাতের শিমলাকে আরো মোহনীয় রুপ দিয়েছে।মনে মনে বললাম আবারও আসবো শিমলা।তবে পরবর্তীতে আরেকটু বেশি সময় নিয়ে। এত অল্পতে শিমলাকে উপভোগ করা যায় না।বুঝা যায়না শিমলার সৌন্দর্যের গভীরতা।
আমার রুট ছিলোঃ
ঢাকা টু কলকাতা (ডিরেক্ট মৈত্রী বাসে)
কলকাতা হাওড়া টু কলকা (হাওড়া দিল্লী কলকা মেইল ট্রেন)
কলকা টু শিমলা (টয়ট্রেন)
ছিলাম হোটেল আমারভিলায় (বুকিং কনফার্ম goibibo.com)
যাযাবরের ডায়েরি.......📙
শিমলা - দ্যা কুইন অব হিলস
শিমলা,হিমাচল প্রদেশ।ইন্ডিয়া
১৭-১৮ জুন,২০১৮।
Comments
Post a Comment