নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আকাশে অবতরণ পূর্বে শেষ কয়েকবার চক্কর দিচ্ছে প্লেন।কলকাতার আকাশে তখন পেঁজা পেঁজা কালো মেঘ।ঘনকালো মেঘে আকাশ ঢাকা।সকাল থেকেই নাকি বৃষ্টি হচ্ছে কলকাতায়,অথচ রওনার হওয়ার সময় দিল্লীতে আগুন ঝড়ে পড়ছিলো আকাশ থেকে।মোটামুটি বেগুন পোড়া হয়ে এসেছিলাম দিল্লী থেকে।
চারদিকে একধরনের হীম হীম শীত শীত ভাব।প্লেন থেকেই নেমে টের পাচ্ছিলাম বাহিরে ভীষণ ঠান্ডা।আকাশ মুখ গোমড়া করে আছে।
![]() |
| মেঘে মেঘ দৌড়ে পালাই!!!....... |
.....
আমার ফ্লাইট ছিলো দুপুর ২.৫৫ মিনিটে দিল্লী ইন্দিরা গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে কলকাতা ট্রানজিট হয়ে ঢাকা।সকাল সকালই ঘুম থেকে উঠে গেলাম।অনেক কাজ করার বাকি ছিলো অথচ এইদিকে হাতে সময় কম।তাড়াহুড়ো করে উঠেই ছুটলাম কেনাকাটা করতে।গত কয়েকদিন খাওয়া,ঘুম বাদে বাদবাকি পুরো সময়টা জুড়েই কেবল ছোটাছুটি করেছি ঘুরাঘুরি করার জন্য,তাই রেস্ট ও কেনাকাটা করার সুযোগ হয়নি তেমনভাবে।
দিল্লীর গরম সম্বন্ধে কোন ধারনাই ছিলো না আমার।ভেবেছিলাম এমন কি আর গরম হবে আমাদের গ্রীষ্মের খড়তাপের মতোই তো হবে আহামরি আর কি?আমার ধারনা বাস্তবতার ধারে কাছেও ছিলো না কি রকম গরম পড়তে পারে দিল্লিতে আর সেজন্য বেশ ভুগতে হয়েছিলো আমাকে।
দিল্লীতে মে জুন মাসে আগুন ঝড়ে।এই সময়টা আমাদের এখানেও গ্রীষ্মকাল,বেশ ভালোই গরম পড়ে তবে সেটা দিল্লীর গরমের কাছে কিছুই না।দিল্লীর গরম এতটা তীব্র মাত্রার ছিলো যে আমি রীতিমতো অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম।বাহিরে বের হলেই তপ্ত লু হাওয়া ধাক্কা দিচ্ছিল।ঘুরাঘুরি করতেও কষ্ট হচ্ছিল।
.....
কোন রকমে বাসার জন্য যৎসামান্য কেনাকাটা করেই ছুটলাম হোটেল চেক আউট করার জন্য,আগের রাতেই ব্যাগ গুছিয়ে রেখেছিলাম সুবিধার জন্য,কিন্তু বিধিবাম সুবিধা হল না।আবারও পুনরায় ব্যাগ গোছাতে হল।তড়িঘড়ি করে হোটেল চেক আউট হয়ে ছুটলাম মেট্রোরেলের উদ্দেশ্য।আমি যেখানে ছিলাম সেটা অনেকটা আমাদের পুরান ঢাকার মত।অসংখ্যা অগনিত গিঞ্জি অলিগলির সমাবেশ,একবার পথ হারালে খুঁজে পাওয়া মুশকিল হয়ে যাবে এমন অবস্থা।
পাহাড়গঞ্জ থেকে দিল্লী মেট্রোরেল ও রেল স্টেশন দুইটাই খুব কাছাকাছি অবস্থানে।হাতে সময় থাকলে ধীরেসুস্থে নেচে-কুঁদে যাওয়া যায়,কিন্তু সবসময় যেটা হয় প্রয়োজনের সময় প্রয়োজনীয় জিনিস খুঁজে পাওয়া যায় না এবারও তার ব্যাতিক্রম হল না।বাধ্য হয়ে ৩০ রুপির ভাড়া ১০০ রুপি দিয়ে ছুটতে ছুটতে পৌছালাম মেট্রোতে।দিল্লির মেট্রোরেলের একটা বিশেষ সুবিধা হল প্রায় সব মেট্রো থেকে সরাসরি বিমানবন্দর যাওয়ার একটা বিশেষ মেট্রোরেল আছে।সাথে হোঁৎকা হোঁৎকা দুইটা ব্যাগ থাকায় সরাসরি বিমানবন্দর পৌঁছাতে পারাটা আমার জন্য ছিলো ভীষণ স্বস্তিদায়ক।
কোনরকমে হাঁচড়েপাঁচড়ে যখন মেট্রোতে উঠলাম তখন ঘড়িতে প্রায় ১১টা ছুঁই ছুঁই।মোটামুটি আধাঘন্টার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে।ঝাঁ চকচকে বিমানবন্দর দেখে মুখ শুকিয়ে আমসি হয়ে গেলো আমার।জীবনে প্রথমবারের মতো প্লেনে চড়তে যাচ্ছি, তাও আবার একা একাই।কোথায় উত্তেজনায় টগবগিয়ে ফুটবার কথা উল্টো আমাকে পেয়ে বসলো নার্ভাসনেস।ভয়ে ভয়ে ভাবছিলাম যদি কোন ভুলত্রুটি হয়?
![]() |
| কারুকার্য করা গজ.......... |
![]() |
| মার্বেল পাথরে তৈরি হস্তশিল্প..... |
.....
ট্যুরের মোটামুটি প্রায় একমাস আগেই অনলাইনে এয়ার টিকেট করে রেখেছিলাম।তখন পর্যন্ত আমার কোন ক্রেডিট কার্ড অথবা ইন্টারন্যাশনাল ডুয়েল কারেন্সি কার্ড ভিসা অথবা মাস্টার কার্ড না থাকায় ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুই করে দিয়েছিলো টিকেট।শুধুমাত্র অনলাইনে টিকেট কনফার্মেশন এর প্রিন্টেড কপি দেখাতেই মূল টিকেট পেয়ে গেলাম ইয়ার ইন্ডিয়ার কাউন্টার থেকে।ও আমার টিকেট ছিলো এয়ার ইন্ডিয়াতে।ই টিকেটের জন্য আমাকে গুনতে হয়েছিলো ৮,৬৭৭ রুপি বা ১০,৫২৭ টাকা।টিকেট করেছিলাম Makemytrip থেকে।
![]() |
| গর্বের সবুজ পাসপোর্ট।বুকের ছাতি ফুলে উঠে এটা হাতে থাকলে.... |
![]() |
| কাকতাড়ুয়া আমি.... |
![]() |
| অসাধারন একটি ভাস্কর্য.... |
![]() |
| বেগুনপোড়া হওয়া আমি.... |
ইন্দিরা গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট বেশ গুছানো ছিমছাম।বিমানবন্দরের ডিউটি ফ্রী শপ এরিয়াতে ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম।অরিজিনাল প্রিন্টের বইগুলো চম্বুকের মত টানতেছিল,বিশেষত ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি ও ট্রাভেলিং এর উপর বইগুলো থেকে চোখ সরাতে বেশ কষ্টই হচ্ছিল।হাতে সময় ছিলো মেলা তাই সাবধানে বইয়ের কালেকশন গুলোর ছবি তুলে তুলে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটালাম।
![]() |
| লোভনীয় সংগ্রহশালা..... |
আবার বোর্ডিং এরিয়াতে ফিরে এসে টার্মিনাল এরিয়া,রানওয়ে,টারমার্কে দাঁড়ানো পেট ফোলা বাজপাখি গুলোর ছবি নিলাম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে।কিছুক্ষণের মধ্যেই ডাক পড়লো বোর্ডিং এর।বোর্ডিং শেষে করে ফাইনাল চেকিং পেরিয়ে বোর্ডিং কার্ড নিয়ে ঢুকে গেলাম বাজপাখির পেটে।
![]() |
| ঝিমিয়ে নিচ্ছে বাজপাখি..... |
![]() |
| দিল্লি এটিসি.... |
![]() |
| দিল্লির গনগনে তপ্ত রোদের রানওয়ে.... |
![]() |
| কর্মব্যাস্ত ইন্দিরা গান্ধি ইন্টারন্যাশনাল ইয়ারপোর্ট..... |
.....
এয়ারক্রাফটে চড়া আমার কাছে তেমন হাতিঘোড়া কিছুই মনে হয়নি,শুধুমাত্র উড্ডয়নের সময় মধ্যাকর্ষন শক্তির টান এবং মাঝ আকাশে মাঝে মাঝে এয়ার পকেটে পড়ে বাম্পিং করা ছাড়া আমার কাছে পুরো সময়টা একটু ভালোমানের এসি বাসে চড়ার মতই লেগেছে।
![]() |
| আকাশ থেকে দিল্লি..... |
![]() |
| বাজপাখির চোখে দিল্লী.... |
![]() |
| দিগন্তের নিলিমা...... ক্ষুধায় চোঁ চোঁ করছিলো পেট।লাঞ্চ পেয়ে আর দেরি করি নাই....
.....
|
প্রথমবার প্লেনে চড়ার উত্তেজনায় হোক বা লম্বা সময় শেষে বাড়ি ফেরার উত্তেজনা (মাত্র বারোদিন আহামরি তেমন কোন সময় নয়) অথচ হাফিয়ে উঠেছিলাম ইতিমধ্যেই।ঐদিকে অফিসের দুশ্চিন্তায়।সবমিলিয়ে যেকোন একটা কারনে আমার দুচোখ এক মুহূর্তের জন্যও বুঝে আসেনি প্রথমবারের প্লেন জার্নিতে।আর দিল্লী থেকে কলকাতা ট্রানজিট হয়ে ঢাকা তেমন লম্বা সময়ের জার্নিও নয় যে বসলেই ঝিমুনি আসবে,আর যাত্রাপথে আমি কদাচিৎ ই ঘুমিয়ে থাকি।আশেপাশের সব সীটের যাত্রীরা ঘুম ভেঙে নামার জন্য তড়িঘড়ি করছে।সবার মধ্যে একটা হুড়োহুড়ি ভাব কার আগে কে নামবে সে চেষ্টা,যেন সবার আগে আগে নেমে প্রথম পুরষ্কারটা দখল করতেই হবে এমন।
প্রোগামিং করা চাবি দেওয়া পুতুলের মত একদম ঠিকঠাক সময়মতো কেমনে সবাই ঘুম ভেঙ্গে উঠে গেলো সেটাই ভাবছি অবাক বিস্ময়ে।
......
কলকাতায় ঘন্টা খানেকের ট্রানজিট, তারপর আবার ঢাকার পথে উড়াল দিবে প্লেন।ঝিরিঝিরি বৃষ্টি মাথায় করে ঝা চকচকে বিমানবন্দর টার্মিনালে বসে আছি ইমিগ্রেশনের অপেক্ষায়।অপেক্ষা করতে করতে বিরক্তি ধরে যাচ্ছিলো।
এবার দেশের বাহিরে এসে ফোনের সীম ও নেটওয়ার্ক সমস্যায় বাসায় কথা হয়নি একবারও।শুধু দুই একবার অনলাইনে বার্তা আদানপ্রদান হয়েছে।
বাসায় নক দিয়ে বললাম আমি আসছি রাতে।বেশ কয়েকদিন ছোটাছুটিতে খাবারের খুব সমস্যা হয়েছে।মুখে কড়া পরে গেছে।আপাকে খাবার ম্যানু ঠিক করে দিলাম কি কি খাবো।বললাম ইচ্ছেমত ঝাল দিয়ে আলুভর্তা করবি সাথে ফোড়ন দেওয়া ডাল এবং কাগুজে লেবু।বলতে বলতে মুখে প্রায় পানি চলে আসলো আমার।মনে মনে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিলাম গরমা গরম সাদা ধোঁয়া উঠা ভাতের সাথে বাগার দেওয়া আলুভর্তা,ডাল ও সুগন্ধি লেবু।ভাবতেই পেট চোঁ চোঁ করে উঠলো।মনে পড়ে গেলো সকাল কিছুই খাওয়া হয়নি।এইসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই ডাক পড়লো ইমিগ্রেশনের।।ঠিকঠাকভাবেই ইমিগ্রেশন পেরিয়ে এসে অপেক্ষা করতে থাকলাম বোর্ডিং এর জন্য।
.....
অদূরের ঝাপসা প্রায় অদৃশ্য আকার আকৃতির ছোটাছুটিতে বেশ বোঝা যাচ্ছে গ্রাউন্ড ক্রুরা কাজ করছে।কনকনে ঠান্ডা বাতাস ও শীতল বৃষ্টিতেও থেমে নেই কর্মযজ্ঞ। কত লোক বিমানবন্দরে আসছে যাচ্ছে।মুহূর্তে মুহূর্তে উঠানামা করছে প্লেন।
![]() |
| কলকাতার আকাশের মন খারাপ.... |
![]() |
| মেঘে ভেজা কলকাতা.... |
![]() |
| কর্মব্যাস্ত এয়ার গ্রাউন্ড ক্রুরা.... |
বিমানবন্দর,নদী বন্দর,দূর পাল্লার বাস স্ট্যান্ডে আসলে অদ্ভুত কিন্তু ভীষন কমন একটা জিনিস নজরে আসে।এখানে কেউ প্রিয় জনকে বিদায় দিয়ে চোখের জলে ভাসছে,আবার অপর দিকে কেউ তার প্রিয় জনের আগমনের অপেক্ষায় উৎসুক হয়ে পথ চেয়ে আছে।একই সাথে আনন্দ ও বেদনার অদ্ভুত এক বৈপরীত্য মনে হয় খুবই কম দেখা যায় মানবজনমে।
প্রিয় মানুষটির পথ চেয়ে চেয়ে ক্লান্তিহীন চোখে অঝোরে জল নামে মানুষটির আগমনে,পরক্ষনেই হই হই করে উঠে ছেলে বুড়ো সবাই।কান্নার পরেই আনন্দের ফোয়ারা।অদ্ভুত বিচিত্র এক অভিজ্ঞতা। অনেক্ষন বসে বসে এই দেখছিলাম।ভাবছিলাম আমার জন্যও কি এমন কেউ অপেক্ষা করে থাকে?হয়তো থাকে হয়তো বা না,কিন্তু আমি ছুটে ছুটে যায় একটু স্নেহের জন্য কাঙ্গালের মত।
এইসব হাবিজাবি ভাবতে ভাবতে ইমিগ্রেশন শেষ করে বোর্ডিং এরিয়ায় ঘুরাঘুরি করছিলাম।হাঁটতে হাঁটতে কাঁচে ঘেরা টার্মিনাল ভবনের সামনে গিয়ে বাহিরে তাকাতেই ঝট করে মনটা ভালো হয়ে গেলো।বাহিরে থেমে থেমে বর্ষন হচ্ছে। দিল্লীতে শুনে এসেছিলাম দুয়েক দিনের মধ্যেই মৌসুমী বর্ষন অর্থাৎ বর্ষা শুরু হবে।মনে হচ্ছে বর্ষা নেমেছে কলকাতার বুকে।মেঘ ও ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে ঢাকা পড়েছে দূরের রানওয়ে এবং এটিসি টাওয়ার।
![]() |
| আলোক ঝলমলে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর |
......
ডাউস সাইজের পেট মোটা বাজপাখির মত প্লেনটা ঝিমুচ্ছে রানওয়েতে।উড়াল দেওয়ার আগে বোধকরি একটু জিড়িয়ে নিচ্ছে দৈত্যটা।বৃষ্টির ছাঁটে টার্মিনাল ভবনের ভেজা কাঁচ ঘোলাটে হয়ে আছে।ঘষা কাঁচের মত সবকিছু ঘোলাটে দেখাচ্ছে ওপাশে।ঠিক ঐ সময়েই ফ্রেমবন্দী করলাম ছবিখানা।
![]() |
| মেঘে ভেজা বাজপাখি..... |
একেকটা সময় কেমন আনমনে কাটে প্রহরগুলো।সেই সময়গুলো শুধুই স্মৃতি রোমন্থন করার জন্য বরাদ্দ।ছবিটা যতবারই দেখি ততবারই ছুটে যেতে মনচায় আগল ভেঙে।
ইচ্ছে করে দূর আকাশে উড়ে বেড়াই.....
মেঘে মেঘ দৌড়ে পালাই!!!
.
.
.
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর,কলকাতা
২৫শে জুন,২০১৮।সোমবার
সন্ধ্যা ৬.৩০ মিনিট।






















Comments
Post a Comment