বিষন্ন সন্ধ্যা..........



আজকে একটু আগে বের হয়েছি অফিস থেকে।সবে সন্ধ্যা নেমেছে।প্রচন্ড ভ্যাপসা গরম গিয়েছে সারাদিন।আগুন ঝড়ছে আকাশ থেকে গত বেশ কয়েকদিন যাবদ।আজকেও ব্যাতিক্রম ছিলো না।সারাদিন আগুনের হুলকা ছেড়েছে সূয্যিমামা।এখনও চারদিকে লু হাওয়া বইছে।গরম হাওয়ায় গায়ে ফোঁসকা ফেলবে এমন অবস্থা।বৃষ্টি হব হব করছে কিন্তু হচ্ছে না।হবে এমন সম্ভবনাও দেখছি না।ভর দুপুরে টুপটুপ করে কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি হয়েছিলো।প্রচন্ড ভ্যাপসা গরম তাতে কমেনি বরংউল্টো বেড়েছে।আগুনে ঘি পড়ারমত হয়েছে ব্যাপারটা।
...

আনমনে হাঁটছিলাম।কোন দিকে যাচ্ছি খেয়াল ছিলো না।হুট করেই রিকশার টুংটাং বেলের শব্দে বাস্তবে ফিরে আসলাম।রিকশাওয়ালা বেজায় খেপেছে।দেখে হাঁটেন না??চোখ কই থাকে মামা??আরো কি কি বলতে বলতে বেল বাজাতে বাজাতে হুশ করে টান দিয়ে চলে গেলো।নগরীর অভিজাত পাড়া এটা।সবচেয়ে বেশি টাকা পয়সাওয়ালা,ক্ষমতাধর মানুষদের আবাস এখানে।এখানকার রিকশাওয়ালারাও স্বাভাবিক ভাবেই একটু অভিজাত,বনেদী টাইপের।পাড়ার মোড়ে যে হাড্ডিসার কঙ্কাল দেহী রিকশাওয়ালা দেখা যায় এরা তেমন নয়।এদের সাথে কথা বলতে হয় হুশ করে।সম্ভবত এখানকার রিকশাওয়ালা গুলোও বুঝে অভিজাত পাড়ার চাকুরে হলেও আমি অভিজাত পাড়ার বিলাসী কোন ধনীর দুলাল নয়,সেজন্য মুখ ঝামটা দিতে কোন কার্পণ্য করে না এরা।মেজাজটা এমনিতেই চটে ছিলো,রিকশাওয়ালার মুখ ঝামটা শুনে বিড়বিড় করতে করতে নিজেকে গালাগাল দিতে দিতে এগিয়ে গেলাম সামনে।মাথায় রাজ্যের চিন্তা কিলবিল করছে।
...

বৃষ্টি হবে কিনা যাচাই করার জন্য আকাশে তাকিয়েই থমকে গেলাম।মাথার সকল চিন্তা নিমেষে থমকে গেলো।আকাশ জুড়ে রংয়ের খেলা।এত গভীর,এত জ্বলন্ত,এত টকটকে,এত বাহারি রংয়ের খেলা শেষ কবে দেখেছি মনে করতে পারলাম না।এত রংয়ের মাঝেও কেমন যেন একটা ঘোর জড়ানো বিষন্নতা ঝুলছে আকাশে।মনে হয় আকাশটা আমার মনেরই প্রতিচ্ছবি।কত শত রঙ্গীন স্বপ্নের মাঝেও মনটা বিবর্ণ ধূসর রংহীন বিষন্নতায় ভুগছে।আপ্রাণ চেষ্টা করি শত প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে হলেও মনের স্বপ্নীল রংগুলো ধরে রাখতে। হয় না,হয়ে উঠে না।আমি পেরে উঠছি না।হেরে যাচ্ছি প্রতি মুহূর্তে।নিজের সাথে সাথে স্বপ্নগুলোও ধুঁকছে টিকে থাকার জন্য। 
...
রোজ রোজ চারপাশে একই দৃশ্য দেখতে দেখতে কেমন যেন একঘেয়ে লাগে।জীবনটা কেমন ছকে কষা বৃত্তে আবর্তন করছে পৌণঃপুনিক ভাবে।এক জীবনে কত উথান পতন!! কত রং বদলের খেলা!!স্বার্থের খাতিরে নিমেষেই রং বদলে ফেলা গিরগিটি টাইপের মানুষের এই স্বার্থপর দুনিয়াতে আমি বেমানান।বড্ড বেমানান।রং বদলের খেলা দেখতে দেখতে আমি মোহাবিষ্ট।এক সময়ে আচ্ছন্ন হয়ে হারিয়ে যাই নিজের মধ্যে নিজেই। 
...
সারাদিন অফিসের ডেস্কে ডেস্কটপটা আকঁড়ে বসে থাকতে থাকতে নিজেকে কেমন নিষ্প্রাণ যন্ত্রের মত লাগে।সেই সকাল থেকে শুরু করে সন্ধ্যা পর্যন্ত (পড়ুন রাত্রি) নিরলস কাজের চাপে পিষ্ট হতে হতে চারপাশে দিন ও রাতের রং বদলের খেলা দেখা হয়ে উঠে না।কখন সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়,কখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়,কখন সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত্রি নামে হিসেবে মিলে না।
...
ডেস্কটপের থীম বা ওয়ালপেপারটা বারবার বদল করি কিছুক্ষণ পরপরই।সারাদিন বেশ কয়েকবারই করি কাজটা,যদিও ডেস্কটপ নিজেই এটা করে স্বয়ংক্রীয় ভাবে। তারপরও ডেস্কটপের কখন করবে সেই অপেক্ষায় থাকতে ইচ্ছে হয় না।একই থীম বা ওয়ালপেপার বেশিক্ষণ থাকলে দেখতে দেখতে হাঁফিয়ে উঠি,কেমন একঘেয়ে লাগে।তাই নিজেই পাল্টে নেই চটজলদি করে।যান্ত্রিক জীবনের যান্ত্রিকতা ও একঘেয়েমী কাঁটাতেই বোধকরি বারংবার ওয়ালপেপার পাল্টে একটু ভিন্নতা আনয়নের চেষ্টা করা।
...
নগরের ইট কাঠের খাঁচায় জীবনটা আষ্টেপৃষ্ঠে বন্দী।চাইলেও এই বন্দীত্ব থেকে মুক্তির উপায় নেই। প্রতিদিন প্রতিনিয়ত অনেকটা বাধ্য হয়ে জীবন্মৃত অবস্থায় বেঁচে থাকার চেষ্টা করে যাওয়া।দূষিত নগরীর ইটকাঠের খাঁচা জীবনের সকল উষ্ণতা কেঁড়ে নিয়ে শীতল বিবর্ণ মৃতের মত করে দিয়েছে জীবনটাকে।এখন শুধুই বেঁচে থাকার অভিনয় করা,ভালো থাকা অভিনয় করা।অভিনয় নিখুঁত হতে হবে ধরা পড়লে চলবে না।
...
নগরীতে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত্রি নামে ঝুপ করেই।সবাই ছুটছে দিকবিদিক জ্ঞান শূন্য ভাবে।আমাকেও ছুটতে হবে।সারাদিন ছুটার উপরই ছিলাম।এখন ক্লান্তি ভর করছে সারা শরীর ও মন জুড়ে। ছুটতে ইচ্ছে করছে না।একটু বিশ্রাম দরকার,একটু প্রশান্তি দরকার।আর ছুটতে মন চায় না।তারপরও উপায় নেই।জীবন আমাকে দৌড় করাতে করাতে ক্লান্ত করে ফেলছে।আরো দৌড় করতে হবে।কতদূর,কত সময়,কতদিন,কতক্ষণ জানি না।জানতেও চাই না।এখন শুধু একটু বিশ্রাম চাই, একটু প্রশান্তি চাই। 
...
ভাবনার জগত থেকে ফিরে আসলাম বাস্তবে।কতক্ষন দাঁড়িয়ে ছিলাম খেয়াল নেই সময়ের দিকে।অন্ধকার হয়ে এসেছে।সন্ধ্যা আকাশের রক্তিম বিষন্নতা মনটাকে আরো বিষন্ন ও ক্লান্ত করে দিয়েছি।প্রকৃতির তীব্র সৌন্দর্যের মাঝেও যে মন খারাপ করে দেওয়া বিষন্নতা লুকিয়ে থাকে জানতাম না।এত রং!!!,কি তীব্র সৌন্দর্য!!! তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ ঝলসে যায় এমন অবস্থা,অথচ আমি শান্তি পাচ্ছি না।আরো বেশি বিষন্নতা আমাকে বিপন্ন করে তুলছে।অনেক কষ্টে চোখ সরিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করলাম বাড়ির পথে মৃতপ্রায় আমি ধুঁকতে ধুঁকতে।

বিষন্ন সন্ধ্যা.......... 

তেপান্তরে হারিয়ে যাওয়া......


সন্ধ্যাবাতি.....


যাযাবরের ডায়েরি........ 📙

১৫ জুলাই,২০১৮।শনিবার

বারিধারা ডিওএইচএস,ঢাকা।



Comments